সিলেট-সুনামগঞ্জের ভোটের মাঠে সরব প্রবাসীরা, অনেকে দিচ্ছেন খরচ
সিলেট জেলার বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে গণসংযোগ করছেন। ভোট চাইছেন। ভোট শেষে আবার ফিরে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মোহাম্মদ আবুল হোসেন দেশে এসে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন। তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভার বাসিন্দা। কয়েকজন বন্ধুসহ মাসখানেক আগে দেশে এসে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন বলে জানালেন।
শুধু আবদুর রব ও আবুল হোসেন নন, তাঁদের মতো হাজারো প্রবাসী সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভোটের মাঠে সরব। কেউ যুক্তরাষ্ট্র থেকে, কেউবা এসেছেন যুক্তরাজ্য থেকে। আছেন ফ্রান্স, বেলজিয়ামসহ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশের প্রবাসীরাও। তাঁদের কেউ কেউ বিএনপির সমর্থক, কেউ আবার জামায়াতে ইসলামীর। এনসিপি, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যান্য দলের সমর্থকেরাও এসেছেন ভোট দিতে, প্রচারে অংশ নিতে।
তবে প্রবাসীরা ছুটে এলেও স্থানীয় লোকজন বলছেন, সিলেটের ভোটের মাঠ এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। আরও সপ্তাহখানেক পর ভোটের আমেজ বাড়বে।
শুধু প্রচার নয়। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনে বিভিন্ন দলের মনোনয়ন পেতে তৎপর ছিলেন অর্ধশতাধিক প্রবাসী। শেষ পর্যন্ত বিএনপি থেকে তিনজন প্রবাসী মনোনয়ন পেয়েছেন। প্রার্থীদের অনেকের ভোটের খরচও মেটাচ্ছেন প্রবাসীরা। সিলেটের ৬টি আসনে মোট প্রার্থী ৩৩ জন। এর মধ্যে ১৭ জন নির্বাচনী ব্যয়ের একটা অংশ প্রবাসী স্বজন ও অন্যদের কাছ থেকে পাচ্ছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।
আক্তার হোসেন রাজু ৩ জানুয়ারি এসেছেন যুক্তরাজ্য থেকে। তিনিও ভোট পর্যন্ত থাকবেন। ছাত্রজীবনে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। এখন দলীয় কোনো পদ-পদবি নেই। তিনি সিলেট ছেড়ে যুক্তরাজ্যে আবাস গড়েন ২০১০ সালে। মাঝে কয়েকবার এলেও ভোটের সময় এবং নির্বাচনকে মাথায় নিয়ে দেশে আসেননি। তাঁর শতাধিক পরিচিত প্রবাসী ভোটের মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন বলে জানালেন সিলেট-১ আসনের এই ভোটার।
আক্তার হোসেন বলেন, জীবনে একবারই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ভোট দিয়েছিলেন, ২০০৮ সালে। দীর্ঘ সময় পর এবার ভোটে অংশ নিতে এসেছেন। দেশে আসা-যাওয়া এবং প্রচারের সব খরচ তাঁর নিজের।
প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময়ও প্রবাসীরা আসতেন। তবে তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী। নির্বাচনে তিনি সম্ভাব্য ব্যয় করবেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে ব্যয় করবেন ১৫ লাখ টাকা। ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী দেবেন ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা দেবেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন।
প্রবাসীর টাকায় ভোট
সিলেটের ৬টি সংসদীয় আসনে এমরান আহমদের মতো ১৭ জন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের টাকা আসবে প্রবাস থেকে। এই অর্থ দেবেন তাঁদের প্রবাসী স্বজন-শুভানুধ্যায়ীরা। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রার্থীদের হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের সম্ভাব্য হিসাব বিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী। নির্বাচনে তিনি সম্ভাব্য ব্যয় করবেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে ব্যয় করবেন ১৫ লাখ টাকা। ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী দেবেন ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা দেবেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন।
একই আসনে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর খরচ করবেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দান পেয়েছেন ২২ লাখ টাকা। এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ফখরুল ইসলাম ২৪ লাখ টাকা খরচ করবেন। এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা দান পাচ্ছেন এক ভাইয়ের প্রবাসী আয় থেকে।
যুক্তরাজ্য থেকে নির্বাচন সামনে রেখে গত নভেম্বরে দেশে এসেছেন আজিজুর রহমান। মূলত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে কাজ করতে এসেছেন তিনি। আজিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সিলেট সদরের ভোটার। তবে প্রচার চালাচ্ছেন গোয়াইনগাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে। সিলেট প্রবাসীদের দেশের রাজনীতির প্রতি টান আছে জানিয়ে আজিজুর বলেন, তাঁরা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে শারীরিক ও আর্থিকভাবে যুক্ত থাকার চেষ্টা করেন। এটা সিলেটের ঐতিহ্য বলা যায়।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী। নির্বাচনে তিনি সম্ভাব্য ব্যয় করবেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে ব্যয় করবেন ১৫ লাখ টাকা। ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী দেবেন ৩৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা দেবেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন।
মনোনয়ন বাগিয়েছেন প্রবাসীরা
সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এম এ মালিক যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক উপদেষ্টা। তিনি গত ১৯ বছরে দেশে আসেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফেরেন। এখানে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম। কিন্তু তাঁদের পেছনে ফেলে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এখন নির্বাচনী মাঠে এম এ মালিক।
যুক্তরাজ্য থেকে সিলেট সদর আসনে ভোট দিতে এসেছেন হেলাল উদ্দিন। তিনি জামায়াতের সমর্থক জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক পরিবেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে, এই আশায় দেশে এসেছেন। যতটুকু সম্ভব নিজের টাকা খরচ করছেন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে। ২৫ বছর পর দেশে ভোট দেবেন জানিয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, মানুষ সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। এ নির্বাচনে যোগ্য ব্যক্তিকেই মানুষ বেছে নেবে।
এ ছাড়া মৌলভীবাজার-২ থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী শওকত হোসেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে এসে নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন তাঁরা।
এখনো পুরোপুরি জমেনি
প্রবাসীরা বিপুল আগ্রহে দেশে ভোটের প্রচারে এলেও স্থানীয়রা বলছেন, এখনো সিলেটের ভোট জমেনি। সিলেট শহরের জিন্দাবাজার এলাকার জেলখানা মোড়ে কথা হয় তরিতরকারি বিক্রেতা আলেক মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে মাইকে প্রচার শোনা যায়। কেউ কেউ ভোট চাইছেন। তবে এখনো সেভাবে জমেনি। আরও কদিন গেলে বোঝা যাবে।
অবশ্য স্থানীয় রাজনীতিকেরা মনে করছেন, ভোটের আমেজ ঠিকই আছে। তবে এবার পোস্টার লাগানো নিষেধ থাকায় এতটা বোঝা যাচ্ছে না। মাইকে প্রচার এবং মিছিলের চেয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়া এবং ছোট ছোট উঠান বৈঠকে জোর দিচ্ছেন প্রার্থী ও সমর্থকেরা।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম চৌধুরী জেলার ৬টি আসনে দলের পক্ষে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রার্থী ও দলের কর্মী–সমর্থকেরা নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি আমেজ চলে আসবে।
জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির ও সিলেট-১ আসনের প্রার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, মানুষ এখন সচেতন। যোগ্য লোক দেখে ভোট দেবে। এ জন্য মিছিল-সমাবেশের চেয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারে জোর দিচ্ছেন তাঁরা। ভোট যত এগিয়ে আসবে, আমেজ দৃশ্যমান হবে।
No comments